Home / বিদেশ / বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র থেকে ‘শহিদ’, কে এই ওসমান হাদি?

বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র থেকে ‘শহিদ’, কে এই ওসমান হাদি?

বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র থেকে ‘শহিদ’, কে এই ওসমান হাদি?

ওসমান হাদি। জন্ম বরিশালে। বাবা ছিলেন মাদ্রাসার শিক্ষক। ছয় ভাইবোনের মধ্যে হাদিই ছিল সর্বকনিষ্ঠ। ওসমান হাদি মাদ্রাসা শিক্ষাশেষে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে। জীবনের মোড় বদলে যায় ২০২৪ সালের মাঝামাঝি। সে বছরের জুলাইয়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে বাংলাদেশ। মূলধারার কোনও রাজনৈতিক দলে সক্রিয় ভাবে যুক্ত না থাকলেও সেই সময় থেকেই আন্দোলনের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন হাদি। জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার দাবিতে হওয়া আন্দোলনে যে সব নেতা অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন, হাদি তাঁদের একজন হয়ে ওঠেন। সেই সঙ্গে তাঁর ‘ভারত বিদ্বেষী’ বক্তৃতা তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। বলা যেতে পারে, হাদির রাজনৈতিক উত্থান হয়েছিল এই আন্দোলনের সময় থেকেই।

জুলাই আন্দোলনের পর হাদির নেতৃত্বে ছাত্র-জনতার একাংশ গড়ে তোলে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চ। এই মঞ্চের মূল দাবি ছিল, যাবতীয় আধিপত্যবাদের বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ন্যায়বিচারের দাবি প্রতিষ্ঠা করা। ক্রমে হাসিনা-বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম কান্ডারি হয়ে ওঠে হাদির দল। চলতি বছরে ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ সংগঠন হিসাবে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবিতে যে ‘ন্যাশনাল অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট ইউনিটি’ গড়ে ওঠে, সেখানেও ইনকিলাব মঞ্চের সক্রিয় ভূমিকা ছিল। ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি ভাঙার ঘটনায় হাদির সক্রিয় উপস্থিতি নিয়ে বিস্তর আলোচনা শুরু হয়। ক্রমে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের রায়, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ-সহ নানা বিষয়ে বক্তৃতা করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন হাদি। তাঁর বক্তৃতার ভাষা নিয়েও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অনেকে হাদির এই নির্ভীকতার প্রশংসা করে হয়ে ওঠেন তাঁর সমর্থক। কেউ কেউ আবার তাঁর ভাষাকে অশালীন বলে সমালোচনা করতে শুরু করেন। অবশ্য সে সবে কান দেননি তরুণ নেতা। আপাত অশালীন ভাষাকে ‘মুক্তির মহাকাব্য’ আখ্যা দিয়ে নিন্দকদের কাছে ক্ষমাও চেয়ে নেন তিনি।

ব্যক্তিগত জীবনে হাদি ছিলেন একজন শিক্ষক, স্বামী এবং এক সন্তানের পিতা। সমাজমাধ্যমেও সর্বক্ষণের সক্রিয় উপস্থিতি ছিল তাঁর। গত নভেম্বরে হাদি নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেন, দেশি-বিদেশি অন্তত ৩০টি নম্বর থেকে তাঁকে ফোন ও মেসেজ পাঠিয়ে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ওই পোস্টে তিনি লেখেন, আওয়ামী লীগের ‘খুনি’ সমর্থকেরা সর্বক্ষণ নজরদারিতে রাখছে তাঁকে।

১২ ডিসেম্বর ঢাকার পল্টন এলাকার কালভার্ট রোডে অটো রিকশায় যাওয়ার সময় অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতীরা তাঁকে গুলি করে। গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ও পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার দ্রুত অবনতি হওয়ায় ১৫ ডিসেম্বর এয়ার অ্যাম্বুল্যান্সে তাঁকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালের নিউরোসার্জিক্যাল আইসিইউ তে চিকিৎসাধীন থাকাকালীন চিকিৎসকরা জানান, তাঁর মস্তিষ্কে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে ও একাধিক অঙ্গ বিকল হতে শুরু করেছে। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে বৃহস্পতিবার তাঁর মৃত্যু হয়। সিঙ্গাপুরের বিদেশ মন্ত্রক আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে।

হাদির মৃত্যুর পরেই বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে শুরু হয়েছে বিক্ষোভ। ছাত্র-যুবদের একাংশ স্লোগান তুলেছে, ‘তুমি কে আমি কে, হাদি হাদি’, ‘আমরা সবাই হাদি হব, গুলির মুখে কথা কব’। শেখ হাসিনা এবং ভারত-বিরোধী স্লোগানও শোনা গিয়েছে বিক্ষোভকারীদের মুখে। শুক্রবার সন্ধ্যায় হাদির মরদেহ ঢাকা বিমানবন্দরে পৌঁছোনোর পরে জনতার পাশাপাশি মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলির নেতানেত্রীদেরও শ্রদ্ধা জানানোর ঢল নেমেছে।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন এবং জুলাই সনদ নিয়ে গণভোট হওয়ার কথা। তার আগেই উন্মত্ত জনতার বিক্ষোভে উত্তাল সে দেশের নানা এলাকা। এই পরিস্থিতিতে নির্বিঘ্নে ভোট হওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচনী আধিকারিক এবং প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনও। এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে কিছু বলা না-হলেও কমিশনের একটি সূত্রকে উদ্ধৃত করে বাংলাদেশের সংবাদপত্র ‘কালের কণ্ঠ’ এমনটাই জানিয়েছে। ওই সূত্রের দাবি, নির্বাচনের কাজের সঙ্গে যুক্ত রিটার্নিং অফিসার এবং সহকারী রিটার্নিং অফিসারদের দফতরের নিরাপত্তা বৃদ্ধি করার নির্দেশ দিয়েছে কমিশন। নির্বাচন কমিশনের অন্য আধিকারিকদেরও নিরাপত্তা জোরদার করতে বলা হয়েছে। ওই সুত্রের আরও দাবি যে, কমিশনকে নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়েছেন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চলা দুই সম্ভাব্য প্রার্থী।

ঘটনাচক্রে, হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার আগের দিনই নির্বাচনী নির্ঘন্ট ঘোষণা করেছিল বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। ত ১২ ডিসেম্বর থেকেই মনোনয়ন জমা দেওয়া শুরু হয়েছে। চলবে ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত। ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি চলবে মনোনয়ন পরীক্ষার কাজ। কোনও মনোনয়ন বাতিল হলে সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করা যাবে ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত। ১২ থেকে ১৮ জানুয়ারি হবে সেই আপিলগুলির যথার্থতা যাচাইয়ের কাজ। চূড়ান্ত প্রার্থিতালিকা প্রকাশ এবং নির্বাচনী প্রতীক নির্ধারণ করা হবে ২১ জানুয়ারি। আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচারের পালা শুরু হবে ২২ জানুয়ারি। চলবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। তবে এর পর নির্বাচন সংক্রান্ত কাজ পরিকল্পনামাফিক হবে কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

এই পরিস্থিতিতে শুক্রবার ইউনূস আবার দেশবাসীকে ‘ধৈর্য ও সংযম’ বজায় রাখার আবেদন জানিয়েছেন। হাদির মৃত্যুতে আগামী শনিবার শোকদিবস পালন করা হবে বলেও জানান। বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। বাংলাদেশের সামগ্রিক এই অরাজক পরিস্থিতি নিয়ে মুখ খুলেছে সে দেশের রাজনৈতিক দলগুলি। খালেদা জিয়ার দল বিএনপি-র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সমাজমাধ্যমে একটি পোস্ট করে লিখেছেন, “ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর পতনের পর দুষ্কৃতীরা আবারও দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি-সহ নৈরাজ্যের মাধ্যমে ফায়দা হাসিলের অপতৎপরতায় লিপ্ত হয়েছে। দুষ্কৃতীদের নির্মম হামলায় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি নিহতের ঘটনা সেই অপতৎপরতারই বহিঃপ্রকাশ।” দুষ্কৃতীদের কঠোর হাতে দমন করার ডাকও দিয়েছেন আলমগীর। একই সঙ্গে সংবাদপত্রের অফিসে হামলার নিন্দা করেছেন তিনি।

অন্য দিকে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধী শক্তি ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’ (‘জামাত’ নামেই যা পরিচিত)-ও এই পরিস্থিতিতে দেশবাসীকে ধৈর্য ধরার আর্জি জানিয়েছে। দলের নেতা শফিকুর রহমান সমাজমাধ্যমে একটি পোস্টে লিখেছেন, “দেশটা আমাদের সকলেরই অস্তিত্বের অংশ। আশা করি সকলেই সর্বোচ্চ ধৈর্যের পরিচয় দেব।” শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগের সমাজমাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকে ভাঙচুরের ভিডিয়ো সংবলিত সংবাদ প্রতিবেদন পোস্ট করা হয়েছে। সংবাদপত্রের অফিসে হামলার নিন্দা করে হাসিনার দল লিখেছে, “এই লুট আর হাঙ্গামার রাজত্ব কায়েম করেছে ইউনূস সরকার, এনসিপি (জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্র-যুবদের একাংশের দল) আর জঙ্গিগোষ্ঠী।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *